দোতলার জানলা থেকে চোখে পড়ে      পুকুরের একটি কোণা।      ভাদ্রমাসে কানায় কানায় জল।    জলে গাছের গভীর ছায়া টলটল করচে      সবুজ রেশমের আভায়।    তীরে তীরে কল্‌মি শাক আর হেলঞ্চ।    ঢালু পাড়িতে সুপারি গাছ ক-টা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এ ধারের ডাঙায় করবী, সাদা রঙন, একটি শিউলি;   দুটি অযত্নের রজনীগন্ধায় ফুল ধরেচে গরিবের মতো। বাঁখারি-বাঁধা মেহেদির বেড়া,   তার ওপারে কলা পেয়ারা নারকেলের বাগান; আরো দূরে গাছপালার মধ্যে একটা কোঠাবাড়ির ছাদ,      উপর থেকে শাড়ি ঝুলচে। মাথায় ভিজে চাদর জড়ানো গা-খোলা মোটা মানুষটি   ছিপ ফেলে বসে আছে বাঁধা ঘাটের পৈঁঠাতে,      ঘণ্টার পর ঘণ্টা যায় কেটে। বেলা পড়ে এল।   বৃষ্টি-ধোওয়া আকাশ, বিকেলের প্রৌঢ় আলোয় বৈরাগ্যের ম্লানতা।       ধীরে ধীরে হাওয়া দিয়েচে,         টলমল করচে পুকুরের জল,         ঝিলমিল করচে বাতাবী-লেবুর পাতা।  চেয়ে দেখি আর মনে হয়।    এ যেন আর কোনো একটা দিনের আবছায়া;      আধুনিকের বেড়ার ফাঁক দিয়ে      দূর-কালের কার একটি ছবি নিয়ে এল মনে।  স্পর্শ তার করুণ, স্নিগ্ধ তার কণ্ঠ,    মুগ্ধ সরল তার কালো চোখের দৃষ্টি।  তার সাদা সাড়ির রাঙা-চওড়া পাড়    দুটি পা ঘিরে ঢেকে পড়েচে;      সে আঙিনাতে আসন বিছিয়ে দেয়,    সে আঁচল দিয়ে ধূলো দেয় মুছিয়ে;   সে আম-কাঁঠালের ছায়ায় ছায়ায় জল তুলে আনে,     তখন দোয়েল ডাকে সজুনের ডালে,     ফিঙে ল্যাজ দুলিয়ে বেড়ায় খেজুরের ঝোপে।      যখন তার কাছে বিদায় নিয়ে চলে আসি     সে ভালো করে কিছুই বলতে পারে না; কপাট অল্প একটু ফাঁক করে পথের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,      চোখ ঝাপসা হয়ে আসে॥ ২৫ শ্রাবণ, ১৩৩৯ — পুনশ্চ (1932)