ক্লিওপেট্রা (নবীনচন্দ্র সেন)
[কাব্য]
শ্রীনবীনচন্দ্র সেন প্রণীত।
কলিকাতা, ১৭, ভবানীচরণ দত্তের লেন,
রায় যন্ত্রে
শ্রীবাবুরাম সরকার দ্বারা মুদ্রিত,
এবং
শ্রীযোগেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কর্ত্তৃক ক্যানিং লাইব্রেরিতে
প্রকাশিত।
সন১২৮৪ সাল।
উৎসর্গ।
শ্রদ্ধাস্পদ
পিতৃব্য-তনয় শ্রীযুক্ত বাবু অখিলচন্দ্র সেন,
এম্, এ, বি, এল্।
দাদা,
আমার ঘটনাপূর্ণ ক্ষুদ্র জীবনের দুইটা শোকাবহ অঙ্ক আপনার অকৃত্রিম স্নেহে এবং ভ্রাতৃ-বাৎসল্যে বিভাসিত। একটী অঙ্ক বহু দিন হইল অভিনীত হইয়া গিয়াছে; দ্বিতীয়টির অভিনয় এখনও শেষ হয় নাই। অদৃষ্ট অন্ধকার; নির্ম্মম সংসারের অস্ত্রাঘাতে সরল কোমল হৃদয় ক্ষত বিক্ষত হইতেছে। এই ঘোরতর অন্ধকারে একটী মাত্র অপার্থিব আলোক সমান ভাবে জ্বলিতেছে, সেই আলোকটী আপনার স্নেহ। আজি আভূতল-বক্ষ হইয়া গলদশ্রু-ধারায় সেই আলোকের পূজা করিয়া এই ক্ষুদ্র কবিতা উপহার প্রদান করিলাম; গ্রহণ করিলে সুখী হইব। আপনি “ক্লিওপেট্রাকে” অন্তরের সহিত ভাল বাসেন। আদরের তৃণও অমূল্য,—এই বিশ্বাসে ক্লিওপেট্রা আপনার করে অর্পিত হইল।
কলিকাতা।
১লা ভাদ্র,
সন ১২৮৪ সাল।
}
আপনার স্নেহের
নবীন।
একটি-কথা।
সংসার যাহাকে পাপ বলে, ক্লিওপেট্রার জীবন সেই পাপে পরিপূর্ণ। অতএব ক্লিওপেট্রাকে সাহিত্য-সমাজে উপস্থিত করিলাম বলিয়া আমি বঙ্গদেশীয় সম্প্রদায় বিশেষের কাছে হয় ত তীব্র কটাক্ষ ভাজন হইব। তবে জানিয়া শুনিয়া এরূপ কবিতা কেন লিখিলাম? বলিতেছি।
স্বভাবের বিচিত্রতা-পরিপূর্ণ মাতৃ-ভূমিতে অবস্থান কালে এক দিন অপরাহ্নে একটি সমুদ্র-সৈকতে বসিয়া ক্লিওপেট্রা জীবনের একখানি ক্ষুদ্র আখ্যায়িকা পড়িতেছিলাম। পাঠ সমাপন করিয়া মস্তক তুলিয়া সন্ধ্যালোকে একটা চমৎকার দৃশ্য দেখিলাম। সম্মুখে তরঙ্গায়িত অনন্ত সমুদ্র; দূরে সলিলাকাশের সন্মিলন-রেখায় মধ্যস্থলে সূর্য্যদেব সলিল-শয্যায় শোভা পাইতেছেন। সেই “জবা কুসুম সংকাশ” মূর্ত্তি বেষ্টিয়া নীলোজ্বল উর্ম্মিমালা নৃত্য করিতেছে। তিনি সেই নৃত্য দেখিতে দেখিতে আনন্দে জলধি-হৃদয়ে বিলীন হইলেন। তখন পট পরিবর্ত্তন হইয়া যেন আর একটী মনোহর দৃশ্য প্রদর্শিত হইল। সান্ধ্য নীলিমায় জলধিব-ক্ষ আচ্ছন্ন হইল; সেই নীলিমা অঙ্গে মাখিয়া তরঙ্গমালা নাচিতে লাগিল। দেখিলাম একটী ক্ষুদ্র তৃণ সেই অসীম সমুদ্র-গর্ভে,—সেই অসংখ্য তরঙ্গাঘাতে, সেই অপ্রতিহত স্রোত প্রভাবে, ভাসিয়া যাইতেছে; কুল পাইতে পারিতেছে না। ভাবিলাম এই সংসারও সমুদ্র বিশেষ। ইহারও তরঙ্গ আছে, স্রোত আছে। ইহাও সময়ে সময়ে এইরূপ সান্ধ্যতিমিরে আচ্ছন্ন হইয়া থাকে। আমরা ইহাতে ওই তৃণের মত ভাসিয়া বেড়াইতেছি। যদি তরঙ্গ এবং স্রোতের প্রতিকূলে যাইতে পারিতেছে না বলিয়া ওই তৃণের কোন পাপ না হয়, তবে মানুষ অবস্থার তরঙ্গ, ঘটনার স্রোত ঠেলিয়া উঠিতে পারে না বলিয়া কেন পাপী হইবে? অভাগিনী ক্লিওপেট্রা সংসারের ঘোরতর ঝটিকায়, তাহার বিশালতম তরঙ্গে ভাসিয়া গিয়াছিল বলিয়া কেনই বা পাপিনী হইল?
যাহাকে পাপী বলিয়া ঘৃণা করি তাহার অবস্থায় পড়িয়া কয় জন পৃথিবীতে পুণ্যবান বলিয়া পরিচিত হইতে পারি? তবে সেই অবস্থা হইতে দূরে থাকা স্বতন্ত্র কথা—সেই অবস্থায় ইচ্ছানুসারে পতিত হওয়া স্বতন্ত্র কথা কিন্তু যাহাদিগকে অনিবার্য্য এবং অনীপ্সিত ঘটনা স্রোতে সেই অবস্থাপন্ন করে আমি তাহাদের কথা,—এই অভাগিনী ক্লিওপেট্রার কথা—বলিতেছি। ক্লিওপেট্রার পিতা পাপিষ্ঠ, জ্যেষ্ঠ, সহোদরা পতি-হন্তা, ক্লিওপেটার ভর্ত্তা শিশু কনিষ্ঠ ভ্রাতা;শিক্ষাদাতা দুরাচার ক্লীব মন্ত্রী। ক্লিওপেট্রার প্রণয়-প্রার্থী-দিগ্বিজয়ী পৃথীপতি সিজার এবং এণ্টনি। এরূপ অবস্থায় পতিত হইয়া। এতাদৃশ প্রণয়ীকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছে যদি এমন রমণী দেখাইতে পার, তিনি দেবী; ক্লিওপেট্রা মানবী। ক্লিওপেটার জীবনের নাম মানব জীবন। ক্লিওপেটার প্রেম
পুরোহিতের মন্ত্রে পবিত্রীকৃত হইয়াছিল না বলিয়া যদি তাহাকে ঘৃণা করিতে হয়, করিও; কিন্তু ক্লিওপেট্রা অবস্থার দাসী বলিয়া দয়া করিও, ক্লিওপেট্রা অভাগিনী বলিয়া দুঃখ করিও।
সমুদ্র তটে সেই সন্ধালোকে ক্লিওপেটার জীবনের আখ্যায়িকা কি পাঠ করিয়া তাহার প্রতি আমার আন্তরিক সহানুভূতি হইয়াছিল। আমি তাহার রূপে মোহিত, প্রেমে দ্রবিত, তাহার অসাধারণ মানসিক শক্তিতে চমকৃত, এবং তাহার হতভাগ্যে দুঃখিত হইয়াছিলাম। ভাবিয়া দেখিলাম ভারতীয় সাহিত্য ভাণ্ডারে এরূপ একটি রত্ন নাই। নাই বলিয়াই, সেই সমুদ্র তটে বসিয়া এই কবিতাটি লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম, এবং সেই দ্বীপে অবস্থান কালেই ইহা সমাপ্ত হইয়াছিল।
ভ্রমসংশোধন।
পৃষ্ঠা
পংক্তি
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
৯
২
…
রঙ্গ ভূমিনায়ক
রঙ্গভূমে নায়ক
৯
১২
…
বীরভার
বীরভরে
১৫
১৬
…
যুড়াইল প্রাণ; সখি!
সখি! যুড়াইল প্রাণ;
১৬
৭
…
করিল বীরেশ
করিলা বীরেশ
১৬
১৫
…
প্রণয়-দাতায়
প্রণয় দাতায়
১৮ পৃষ্ঠায় ৮ম পংক্তির শেষে — চিহ্ন হইবে
১৯
১৭
…
উন্মিলিল
উন্মেষিল
ঐ
১৯
…
বিলম্বিল
বিলম্বিত
২০
১২
…
বর্ণ
কর্ণ
২২
১৭
…
নিরাশ
নিরাশা
২৫
১৪
…
সঙ্গীত-বিহ্বল
সঙ্গীত বিহ্বল
২৮
১১
…
করিছে
করিতে
৩৪
৭
…
তার
তরে
৩৬
১৮
…
—সে‘কি
‘সেকি
৪২
৬
…
ঝাপ
ঝাঁপ
৪৫
৫
…
ক্ষমিও এণ্টনি!’
‘ক্ষমিও এণ্টনি!’
৪৫
১৮
…
ক্ষমিও এণ্টনি’
‘ক্ষমিও এণ্টনি’
৪৬
১৮
…
প্রথমেই কোট ‘চিহ্ন বসিবে।
ক্লিওপেট্রা।
বিধির অনন্ত লীলা!—অনন্ত সৃজন!
এক দিকে দেখ, উচ্চ ভীমাদ্রি-শিখর,
ভেদিয়া জীমূত-রাজ্য আছে দাঁড়াইয়া,—
প্রকৃতি-গৌরব ধ্বজা, অচল, অটল;
অন্য দিকে দেখ নীল ফেণিল সাগর
ব্যাপিয়া অনন্ত রাজ্য!—সতত চঞ্চল,
অচিন্ত্য জীবনে যেন সদা সঞ্চালিত,
সদা বিলোড়িত, সদা কম্পিত, গর্জ্জিত।
উপরে অসীম নভঃ নক্ষত্র-মালায়
প্রজ্বলিত—কে বলিবে কত কাল হ’তে?
কে বলিবে কত কাল প্রজ্বলিত রবে?
নীচে নীল নীর-রাজ্য—অনন্ত, অসীম;
কত কাল হ’তে তাহে ভাসিতেছে হায়!
অসংখ্য পৃথিবী-খণ্ড কে বলিতে পারে;
কে বলিবে কত কাল ভাসিবে এ রূপে?
মধ্যে এক খণ্ড বারি!—এক তীরে তার
পুণ্য ভূমি ইউরোপ জুড়ায় নয়ন,
রঞ্জিত স্বভাবে, শিল্পে—চারু অলঙ্কৃতা!
অন্য তীরে প্রকৃতির প্রকাণ্ড শ্মশান,
মরুভূমে ভয়ঙ্কৃৃতা “আফ্রিকা” ভীষণ!
বিধির অনন্ত লীলা! কে বলিবে হায়!
এই দুই রাজ্য এক শিল্পীর সৃজন!
লজ্জিতা প্রকৃতি বুঝি তাই রোষ-ভরে,
হতভাগ্য “আফ্রিকায়” করিতে মগন
অনন্ত জলধি-জলে, দুই মহা শাখা
করিলা প্রেরণ দুই সূচী-রন্ধ্র পথে—
উত্তরে “ভূমধ্য,”—পূর্ব্বে “রক্তিম-সাগর”।
দুঃখিনী আফ্রিকা ভয়ে পড়িল কাঁদিয়া
“এসিয়া”-চরণ-তলে; ভারত-গর্ভিনী
দিলেন অভয়, রাখি স্কন্ধের উপরে
চরণ-কনিষ্ঠাঙ্গুলি; অশক্ত বারীশ
বলে টলাইতে তারে! সেই দিন হ’তে,
পুণ্যবতী “এসিয়ার” শুভ পরশনে,
মরু-ভূমি-মধ্যে মৃগতৃষ্ণিকার মত,
সোণার মিশর রাজ্য হইল সৃজন।
মিশর অপূর্ব্ব সৃষ্টি! দৃশ্য মনোহর!
বিশাল অরণ্য যার দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর;
আপনি সাগর গড়; প্রহরীর প্রায়
আছে দাঁড়াইয়া, জগত-বিস্ময়
“টলেমির” চির-কীর্ত্তি-স্তম্ভ সারি সারি।
অদূরে আলোক-স্তম্ভ—আকাশ-প্রদীপ!
জ্বলিতেছে নীলাকাশে নক্ষত্রের মত,—
নিশান্ধ নাবিকগণ-নয়ন-রঞ্জন!
শিল্পীর গরব ভাবি প্রকৃতি মানিনী,
আগে দিলা “নীল” নদী নীল মণি-হার,—
তরল আভায় পূর্ণ! ভুবন-বিজয়ী
“মেকিডন”-অধিপতি গ্রন্থি-স্থলে তার,
বিশ্ব-খ্যাত রাজধানী করিলা স্থাপন।
রাজধানী রাজ-হর্ম্ম্যে বসিয়া নিরবে,
বিরস বদনে আজি টলেমি দুহিতা
ক্লিওপেট্রা;—মরি! চিত্র বিশ্ববিমোহিনী!
ধরা-ব্যাপী “রোম” রাজ্যে, যে রূপের তরে
ঘটিল বিপ্লব ঘোর; যে রূপ-শিখায়
বিশ্বজয়ী বীরগণ,—যাহাদের হায়!
বীরপণা ইতিহাসে রয়েছে লিখিত
অমর অক্ষরে! করে, অস্ত্রে যাহাদের
সমগ্র পৃথিবী-ভার ছিল সমৰ্পিত!—
সিজার, এণ্টনি,—এই নামযুগলের
সসাগরা বসুন্ধরা ছিল সমতুল!—
হেন বীরগণ, যেই রূপের শিখায়
পড়িয়া পতঙ্গ-প্রায় হ’লো ভস্মীভূত,
কেমনে বর্ণিব আমি সে রূপ কেমন?
মিশর-বিহনে এই আফ্রিকা যেমন
মরুভূমি, এই রূপ-বিহনে তেমন—
কেবল মিশর নহে—এই বসুন্ধরা
বিস্তীর্ণ অরণ্য-সম। চিত্রিব কেমনে
হেন রূপরাশি?–রূপ অনুপম ভবে!
কল্পনা-অতীত রূপ, নহে চিত্রনীয়!
বিষাদ-আঁধারে এই রূপ কহিনুর
জ্বলিতেছে, ভাসিতেছে সুখতারা-সম
বিষাদ-আকাশ-গায়ে যুগল-নয়ন।
দুই বিন্দু—দুই বিন্দু বারি,—মুক্তানিভ!—
আছে দাঁড়াইয়া দুই নয়ন-কোণায়;
নড়ে না, ঝরে না,—আহা! নাহি চাহে যেন
ত্যজি সেই অনঙ্গের আনন্দ-আসন,
পড়িতে ভূতলে; হেন স্বৰ্গ-ভ্রষ্ট হ’তে
কে চাহে কখন? যেই নয়নের জ্যোতিঃ
কামান-অভেদ্য বক্ষে করিয়া প্রবেশ,
উচ্ছাসিয়া হৃদয়ের বিলাস-লহরী,
ভাসাইল তাহে রোম-হেন রাজ্য-লিপ্সা,—
সসাগরা পৃথিবীর রাজ-সিংহাসন!
আজি সেই নেত্র আহা! সজল এমন!
বিষাদ-লহরী, পূর্ণ বদন-চন্দ্রিমা,
রত্ন-রাজাসন পৃষ্ঠে ফেলেছে ঠেলিয়া;
অপমানে কেশরাশি বিলম্বিয়া কায়,
আসনের পৃষ্ঠ বাহি পড়িয়া ধরায়,
বিদারি ভূতল চাহে পশিতে তথায়;—
“রোমেশ”-হৃদয় যার অতুল আধার,
স্বর্ণ সিংহাসন তার তুচ্ছ অতিশয়?
রক্ষিত যুগল কর, বক্ষে রমণীর—
হায়! যেই রমণীর কর-সঞ্চালনে
বীরগণ-হৃদয়ও হইত চঞ্চল,
প্রণয়-তাড়িত-ক্ষেপে;—ইঙ্গিতে যাহার
চলিত পুত্তল-প্রায় ধরার ঈশ্বর,—
আজি সেই কর আহা! অবশ, আচল!
পাষাণ হৃদয়োপরে, পাষাণের প্রায়
রয়েছে পড়িয়া; বুঝি হৃদয়-পিঞ্জর
ভাঙ্গি রমণীর প্রাণ চাহে পলাইতে,
সেই হেতু হায়! এই যুগল পাষাণ,
রেখেছে চাপিয়া সেই হৃদয়-কবাট।
দৃষ্টিহীন সঙ্কোচিত যুগল নয়ন,—
অপলক, অচঞ্চল! চাহি ঊৰ্দ্ধ পানে;
কৃষ্ণ রেখান্বিত দুই কমলের দলে,
হইয়াছে যেন নীলমণি সন্নিবেশ!
মরি! কি বিষাদ মূর্ত্তি!
সম্মুখে বামার,
রতন-খচিত শ্বেত প্রস্তরের মঞ্চে,
শোভিছে আহার্য্যচয়; বহু-মূল্য পাত্রে
শোভিছে মিশর-জাত সুরা নিরমল।
উপরে জ্বলিছে দীপ বিলম্বিত ঝাড়ে;
বিমল স্ফটিক-দীপ শাখায় শাখায়
জ্বলিতেছে, চারু চিত্র-খচিত দেয়ালে।
অনন্ত-আনন্দময়ী, আমোদ-রূপিনী
ক্লিওপেট্রা সুন্দরীর, এই সেই কক্ষ
মনোহর! –অনঙ্গের চির-বাস!রতি
অধিষ্ঠাত্রী দেবী!—যেই কক্ষ-আনন্দের
ধ্বনি, অতিক্রমি সিন্ধু, প্রবেশিয়া রোমে
“সেনেট”-মন্দিরে হ’তো প্রতিধ্বনিময়!
গণিত রোমেশ কেহ রোমে নিশি জাগি
লহরী যাহার! সেই আনন্দ-ভবনে
আজি কেন দেখি সব নীরব, অচল!
অচল আলোকরাশি; দেখায় দেয়ালে
অচল মানব-চিত্র; অচলিত ভাবে
পড়ে আছে যন্ত্রচয় যন্ত্রী-অনাদরে।
অচল অনীল কক্ষে, অজ্ঞাত পরশে
আন্দোলিত হ’য়ে পাছে মধুর “গিটার”
বামার বিষাদ-স্বপ্ন করে অপনীত।
অচল বামার মূর্ত্তি; অচল হৃদয়ে
অচল যুগল-কর; অচল জীবন
স্রোত; চিত্রার্পিত-প্রায়, দাঁড়াইয়া পাশে
অচল সখীর শোকে, সহচরীদ্বয়।
কেবল বামার সেই অচল হৃদয়ে,
সবেগে বহিতেছিল ঝটিকা তুমুল!
“ওলো চারমিয়ন!” চমকিল সখীদ্বয়
বামার বিকৃত কণ্ঠে, হ’লো রোমাঞ্চিত
কলেবর; যেন এই তমসা নিশীথে
শ্মশান হইতে স্বর হইল নির্গত!
“ওলো সহচরি! এই হৃদয়-মন্দিরে
অভিনেতা ছিল যেই প্রণয় দুর্লভ,
অন্তর্হিত হ’লো যদি, তবে কেন আর
এ বিলম্ব যবনিকা হইতে পতিত?
শূন্য আজি রঙ্গভূমি! যৌবন-পরশে
উঠিল প্রথমে যবে প্রেম-আবরণ,
দেখিলাম রঙ্গভূমি নায়ক এণ্টনি!
জীবন-সঙ্গীত-স্রোতে খুলিল নাটক,—
ক্লিওপেট্রা-জীবনের চারু অভিনয়।
“সুখদ প্রমথ অঙ্কে,—ওলো চারমিয়ন!
আছে কি লো মনে? অনন্ত বালুকাময়ী
প্রাচী মরুভূমি—পন্থাহীন, বারিহীন;
পদতলে প্রজ্বলিত বালুকা-অনল;
তৃষ্ণাগ্নি হৃদয়ে; শিরে উল্কা রাশি রাশি,
শত্রু-শস্ত্র-বিনির্গত, হতেছে বর্ষণ;
তবু অতিক্রমি হেন দুস্তর প্রান্তর
বীরভার, উড়াইয়া ইন্দ্রজালে যেন,
শত্রু-সৈন্যচয়, শুষ্ক পত্ররাশি যেন
ভীম প্রভঞ্জনে হায়! প্রবেশিল যবে
দিগ্বিজয়ী রোম-সৈন্য মিশর নগরে?
লতা গুল্ম তরু তৃণ দলিয়া চরণে,
পশে গজযূথ যথা কমল-কাননে!
বিজয়ী বীরেন্দ্র-ব্যূহ-নগর-প্রবেশ
নিরখিতে, বসেছিনু অলিন্দে বিষাদে,
চিত্ত কৌতূহলময়! পদতলে মম
প্লাবিয়া প্রশস্ত পথ, সৈন্যের প্রবাহ
প্রবাহিত; দেখিলাম,—আর নাহি সখি!
ফিরিল নয়ন মম; ডুবিল মানস
সেই প্রবাহ-ভিতরে।
ষোড়শ বর্ষীয়া
সেই বালিকা-হৃদয়ে, অজ্ঞাতে, কি ভাব
প্রবেশিল, অভিনব; হেন ভাব সখি!
কি পূর্ব্বে, কি পরে, শৈশবে, যৌবনে,
আরত কখন করি নাই অনুভব।
সেই যে প্রথম আহা! সেই হ’লো শেষ!
চিত্ত-মুগ্ধকরী ভাব! চিত্ত-উন্মাদিনী।
বালিকার অরক্ষিত হৃদয় মোহিল।
কোথায় রোমীয় সৈন্য, কোথায় মিশর,
কোথায় তখন বিশ্ব—গগন—ভূতল?
অদৃশ্য হইল সব নয়নে আমার।
কেবল একটী মূর্ত্তি,—বীরত্ব যাহার
মিশি সরলতা, দয়া, দাক্ষিণ্যের সনে,—
আতপ মিশিয়া যেন চন্দ্রিকা শীতলে!–
ভাসমান ছিল, শ্বেত প্রশস্ত ললাটে;
প্রজ্বলিত নেত্রদ্বয়; চির বিরাজিত
উন্নত প্রশস্ত বক্ষে; ক্ষরিত প্রত্যেক
বীর—পদ-সঞ্চালনে;—হেন মূর্ত্তি সখি!
লুকাইয়া অনুপম বীরত্বে তাহার,
সৈন্যের প্রবাহ—যথা মহীরুহচয়,
লুকায় চন্দ্রমাচল আপন গহ্বরে!—
ভাসিল নয়নে মম, ব্যাপিয়া হৃদয়,
ব্যাপিয়া অনন্ত বিশ্ব, ভূতল, গগণ।
সেই মূর্ত্তি, সখি, মম বীরেশ এণ্টনি!
চঞ্চলিয়া বালিকার অচল হৃদয়
প্রথম প্রণয়াবেশে—স্বরগ, ভূতলে!—
সেই মূর্ত্তি, প্রিয় সখি! হইল অন্তর
সুদূর সুন্দর রোমে, কিছু দিন-তরে।
স্থির জলধির জল করিয়া চঞ্চল,
দ্বিতীয়ার চন্দ্র সখি! গেল অস্তাচলে!
“খুলিল দ্বিতীয় অঙ্ক। জনক আমার—
পিতৃনিন্দা, দেবগণ! ক্ষমিও আমারে!—
অস্ত্রধারী টলেমির বংশে বংশী-ধর
কুলাঙ্গার! বিসর্জ্জিয়া স্বাধীন মিশরে
রোম-রূপী শার্দ্দূলের বিশাল কবলে;
পতিহন্তা, পাপীয়সী; জ্যেষ্ঠ দুহিতার
তপ্ত শোণিতাক্ত, ভ্রষ্ট সিংহাসনে সুখে
আরোহিয়া,—বিধাতার কেমন বিধান!
পতিহন্তা দুহিতার কন্যা-হন্তা পিতা!
অবশেষে, হায়! দুঃখ বলিব কেমনে!
দশম বর্ষীয় শিশু কনিষ্ঠে আমার,
করি আমি যুবতীর পতিত্বে বরণ;—
সেই খানে ক্লিওপেট্রা-জীবন-উদ্যানে,
যেই বীজ, প্রিয় সখি! হইল রোপণ,
সে অঙ্কুরে কি পাদপ জন্মিল স্বজনি!
কি ভীষণ ফল পুনঃ ফলিবেক আজি!
বধি জ্যেষ্ঠ দুহিতায়; বধিতে আমায়,
সেই দিন মৃত্যু-অস্ত্র করিয়া সৃজন;
ডুবায়ে মিশরে; আহা! ডুবিয়ে আপনি;
ডুবায়ে “টলেমি”-বংশ; জনক আমার
সম্বরিলা নরলীলা, নব দম্পতীরে
সমর্পিয়া দুরাচার ক্লীব মন্ত্রী-করে,
দুগ্ধের প্রহরী করি পাপিষ্ঠ মার্জ্জারে।
“না হ’তে পিতার শেষ নিশ্বাস নির্গত,
সিংহাসন হ’তে পাপী—ফেলিল আমায়
পূর্ব্বারণ্যে। হা অদৃষ্ট! রাজার উদ্যানে
ফুটেছিল যে কুসুম, পড়িল নিদাঘে
মরু ভূমে।—সে যে দুঃখ কহা নাহি যায়!
কিন্তু নারী-প্রতিহিংসা, প্রচণ্ড, অনল,
শীতলিল মার্ত্তণ্ডের মধ্যাহ্ন-কিরণ।
সহসা মিলিল সৈন্য। সেনাপত্নী আমি
সাজিনু সমর-সাজে। কবরীর স্থলে।
বাঁধিলাম শিরস্ত্রাণ, উরস্ত্রাণ উচ্চ
কুচযুগোপরে। যেই কর কমনীয়
কুসুম-দামের ভারে হইত ব্যাথিত,
লইলাম সেই করে তীক্ষ্ণ তরবার;
পশিলাম এই বেশে মিশর-ভিতরে,
ক্লীব-রক্তে নীল নদী করিতে লোহিত,
কিম্বা বীরাঙ্গণা-রক্তে রঞ্জিতে মিশরে।
হেন কালে রোম-রাজ্য বিপ্লাবি, বিলোড়ি,
ভীষণ তরঙ্গদ্বয় সিন্ধু অতিক্রমি,
পড়িল জীমূত-মন্দ্রে মিশরের তীরে;
কাঁপিল মিশর সেই ভীষণ আঘাতে।
রণোন্মত্ত অসিদ্বয়পড়িল খসিয়া।
এক ঊর্ম্মি হ’লো লয় সমুদ্র-সৈকতে,
দ্বিতীয় উঠিল শূন্য সিংহাসনোপরে!
“সিজার মিশরে!—দূরে গেল রণ-সজ্জা।
নব “ফার্শেলিয়া,” “পম্পি,” বিজয়ী সিজার,
মিশরের সিংহাসনে! খুলিলাম সখি!
রণবেশ, দীনাবেশে রোমেশ-চরণে
পড়িলাম,—সে কুহক আছে কি হে মনে?
ঝটিকায় ছিন্নমূল ব্রততী যেমতি,
বন্দে মহীরুহ, হায়! নিরাশ্রয়া লতা!
“সে ঐন্দ্রজালিক, সখি! কর-সঞ্চালনে
নিবারি তুমুল ঝড়, রক্ষিল আমারে,
আলিঙ্গিয়া স্নেহ ভরে। প্রিয় সখি! হায়!
জীবনে প্রথম এই,—এই মরু ভূমে—
স্নেহ-সুশীতল বারি হ’লো বরিষণ।
নিষ্ঠুর জনক যার; নিষ্ঠুরা ভগিনী;
শিশু সহোদর ভর্ত্তা; মন্ত্রী নরাধম;
সে কিসে জানিবে সখি! স্নেহ যে কি ধন?
পূরাইল আশা, যুড়াইল প্রাণ; সখি!—
বসিলাম সিংহাসনে। বসিলাম?–ভীম
ভূকম্পনে, কিম্বা অগ্নি-গিরি-উদ্গীরণে,
টলিতে লাগিল মম নব সিংহাসন।
দেখিলাম অন্ধকার, ঘূরিল মস্তক,
পড়িতে ছিলাম সখি! মূর্চ্ছিত হইয়া
অকুল সাগরে। কি যে বীরপণা, সখি!
জলে, স্থলে, কি অনলে করিল বীরেশ,
স্বচক্ষে দেখেছ তুমি! শুনেছ শ্রবণে।
দেখিলাম মূর্চ্ছাভঙ্গে মেলিয়া নয়ন,
ভাসিয়াছে শিশু ভর্ত্তা শত্রুদল-সহ,
অনন্ত-জীবন-জলে; বসিয়াছি আমি
মিশরের সিংহাসনে,—বলিব কেমনে
সেই লজ্জা?—সিজারের হৃদয়-আসনে!
কৃতজ্ঞতা-রসে, সখি, ভরিল হৃদয়।
ধন, প্রাণ, সিংহাসন, প্রণয় দাতায়,
করিলাম, সহচরি, আত্ম-সমৰ্পণ।
কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতা—জান সমুদয়—
সেই কৃতজ্ঞতা শেষে কোথা হ’লো লয়!
একে প্রাণদাতা, তাহে পৃথিবী ঈশ্বর,
ততোধিক ভুজবলে ভুবন-বিজয়ী,
এত প্রলোভন!—সখি! পড়িলাম আমি,
অজগর-আকর্ষণে, সরল হরিণী।
“হেন কালে চারি দিকে সমর-অনল
জ্বলিল; সিজার এই মিশরে বসিয়া
দেখিল অনল-শিখা। বৈশ্বানর রূপে
ঝাঁপ দিল সখি! সেই বহ্ণির ভিতরে।
নিবাইল কটাক্ষেতে শোণিত-প্রবাহে
সে অনল! বাহুবলে আপনি সমুদ্র
রহিয়াছে বন্দী যার রাজ্যের ভিতরে,
এই ক্ষুদ্র অগ্নিশিখা কি করিবে তারে?
বিজয়-পতাকা তুলি; ভীম সিংহনাদে
কাঁপায়ে ভূধর-শ্রেণী সুদূর উত্তরে;
ডুবায়ে জলধি-মন্দ্র অদূর দক্ষিণে;
ছড়ায়ে গৌরব-ছটা দিগ্ দিগন্তরে;
ঢালিয়া আনন্দ-স্রোত অজস্র ধারায়
রাজ পথে; প্রবেশিল বীর অহঙ্কারে,
দীগ্বিজয়ী বীরবর রোম-রাজধানী।
সতী সহধর্ম্মিণীর স্বপ্ন উপেক্ষিয়া
চলিল সেনেট-গৃহে,—হায়! জাল-মুখে
প্রলোভনে মুগ্ধ ক্ষিপ্ত কেশরী যেমতি,
ক্ষুধার্ত্ত!—‘তোমরা কেহে?তোমরা দুজন?
বিষন্ন গম্ভীর মুখে? চৌষট্টি রৌরব
যেন ভাবিতেছ মনে? কণ্টক-স্বরূপ
কেন সিজারের পথে, আছ দাঁড়াইয়া?
জান না সিজার আজি হইবে ভূপতি?
সরে যাও’।—বীরবর সেনেট-মন্দিরে
প্রবেশি বসিল স্বর্ণ চারু সিংহাসনে।
‘বিশ্বজয়ী মহারাজা সিজারের জয়!’
আনন্দে ধ্বনিল শত সহস্র জিহ্বায়।
আনন্দে রোমান-বাদ্য করিল সঞ্চার
নর-রক্তে সেই ধ্বনি; পূরিল গগন
সেই জয় জয় রবে; নামিতে লাগিল
রোম-ইতিহাসে এই প্রথম মুকুট
সিজারের শিরোপরে, এণ্টনির করে।
ফুরাল;—কি? সিজারের রাজ্য-অভিষেক?
কেন আনন্দের ধ্বনি থামিল হটাৎ?
নিরবিল যন্ত্রীদল? কেন অকস্মাৎ
এই হাহাকার? সখি দেখিনু সম্মুখে;
কি দেখিনু? ইহ জন্মে ভুলিব না আর।
ভূপতিত, হা অদৃষ্ট! বীরেন্দ্র সিজার!
কোথায় মুকুট সখি! বক্ষে তরবার!”
কণ্টকিল রমণীর কম কলেবর;
বিস্ফারিল নেত্রদ্বয়; সহিল না আর
অবলা-হৃদয়, মূর্চ্ছা হইল রমণী।
সুগন্ধ তুষার-বারি, নয়নে, বদনে,
তুষার উরস শ্বেতে, সহচরীদ্বয়
বরষিল; কিছুক্ষণ পরে রূপসীর
অচল হৃদয়-যন্ত্র, জীবন-পবন-
স্পর্শে চলিল আবার; খুলিল নয়ন,—
প্রভাতে দক্ষিণানীল কোমল পরশে,
উন্মিলিল যেন ধীরে কমলের দল।
অৰ্দ্ধ-উন্মিলিত নেত্র, এক দৃষ্টে চাহি
কক্ষে বিলম্বিল এক চারু চিত্র-পানে,
বলিতে লাগিল বামা—“ওই, সহচরি!
ওই যে দেখিছ চিত্র,—নিসর্গ-দৰ্পণ!—
অপূর্ব্ব অঙ্কিত! ওই দেখ ওই,
‘চিদনস’-স্রোতে ওই প্রমোদ-তরণী,
ভাসিতেছে, নাচিতেছে, বারিবিহারিণী।
হাসিতেছে, জ্বলিতেছে পশ্চিম-তপনে,
প্রতিবিম্বে ঝলসিয়া তরল সলিল।
ময়ূর ময়ূরী প্রেমে মুখে মুখ দিয়া,
বঙ্কিম গ্রীবায় ভাসে তরী-পুরোভাগে;
চন্দ্রক কলাপরাশি—নয়ন-রঞ্জন!—
চারু চন্দ্রাতপ রূপে শোভিছে পশ্চাতে।
তাহার ছায়ায় বসি কর্ণিকা রূপসী;
নাচে স্বর্ণ বর্ণ, বদ্ধ কুসুম-মালায়
কুসুম কোমল করে। বসন্ত রঙ্গের
নাচিতেছে সুবাসিত সুন্দর কেতন,
সৌরভে-মোহিত-মৃদু অনিল-চুম্বনে।
তরণীর মধ্যদেশে, সুবর্ণ-খচিত
চন্দ্রাতপ-তলে, স্বর্ণ-কমল আসনে,
বারুণী-রূপিণী, ওই তরণী-ঈশ্বরী;—
আপনার রূপে যেন আপনি বিভোর!
দুই পাশে সুকুমার কিঙ্কর-নিচয়
দাঁড়ায়ে মন্মথবেশে, সস্মিত বদন,
ব্যজনিছে ধীরে ধীরে বিচিত্র ব্যজনে।
কিন্তু সে অনীলে কই যুড়াবে বামায়,
বরং হইতেছিল কোমল পরশে,
কাম লালসায় উষ্ণ কপোল যুগল!
সম্মুখে অঙ্গনাগণ, অনঙ্গ-মোহিনী,
কোমল মদনোন্মাদ সঙ্গীত তরল
বর্ষিতেছে নানা যন্ত্রে; তালে তালে তার
পড়িছে রজত দাঁড় রজত সলিলে;
তরণী সুন্দরী, ভুজ-মৃণালেতে যেন,
আলিঙ্গিছে প্রেমাহ্লাদে নদ ‘চিদনসে!’
সে সুখ-পরশে নাচি স্রোত হিল্লোলিয়া,
প্রেম-মুগ্ধ ছুটিতেছে তরণী পশ্চাতে।
নাচিছে তরণী;—মরি! সেই নৃত্য, সেই
সলিলের ক্রীড়া, সখি! দেখ চিত্রকর
চিত্রিয়াছে কি কৌশলে! নাচিতে নাচিতে
চুম্বিয়া সরিৎ-বক্ষ, কহি কাণে কাণে
অস্ফুট প্রণয়-কথা তর তর স্বরে,
চলেছে রঙ্গিণী ওই, মৃদুল মৃদুল
সৌরভে করিয়া, মরি! ইন্দ্রিয় অবশ!
নগর, সজীব দীর্ঘ-দর্শক-মালায়,
সাজায়েছে দুই তীর। উচ্চ সিংহাসনে
অদূরে নগরে বসি একাকী এণ্টনি,
ডাকিছে অস্ফুট সিসে অপহৃত মন।
কিন্তু সখি! তৃষ্ণাতুর সহস্র নয়ন,
যে রূপ-সুধাংশু-অংশু করিতেছে পান
কে ওই রমণী,—সর্ব্বদর্শক-দর্শন?
ক্লিওপেট্রা? আমি? না, না, সখি!অসম্ভব
সেই যদি ক্লিওপেট্রা, আমি তবে নহি।
আমি যদি ক্লিওপেট্র, তরী-বিহারিণী
ওই চিত্র, নহে সখি! আমি দুঃখিনীর।
সেই মুখে হাসি-রাশি, এ মুখে বিষাদ;
সে হৃদয়ে সুখ, সখি! এ হৃদয়ে শোক।
সে যে ভাসিতেছে সুখে প্রণয়-সলিলে,
আমি ডুবিয়াছি হায়! নিরাশ-সাগরে।
যেই মনোহর বেশ, ওই চিত্রে, সখি!
শোভিতেছে মরি! যেন শারদ-কৌমুদী
বেষ্টিয়া কুসুম-বন, আজিও সে বেশে
সজ্জিত এ বপুঃ মম; কিন্তু সহচরি!
সেই শোভা—এই শোভা—কতই অন্তর!
আজি সেই বেশ, স্বর্ণ হীরক খচিত,
নিবিড় তমিস্ৰ যেন সমাধি বেষ্টিয়া!
সে দিন প্রেমের শুক্ল-দ্বিতীয়া আমার,
আজি হায়! নিরাশার কৃষ্ণা চতুর্দ্দশী!”
নীরবিল ধীরে বামা; মধুর বাঁশরী
গাইয়া বিষাদ-তান, নীরবে যেমতি।
স্থির নেত্রে কিছুক্ষণ চাহি শূন্য-পানে,
বলিতে লাগিল পুনঃ ইন্দীবরাননা;—
“চলিল তরণী বেগে, চলিলাম আমি
ভেটিতে এণ্টনি; সখি! করিতে অর্পণ
বালিকার চিত্ত-চোরে, যুবতী-যৌবন।
যত অগ্রসর তরী হ’তেছিল বেগে,
ততই হইতেছিল মানস আমার
সঙ্কুচিত,—নির্ঝরিণী-মুখে যথা নদ
‘চিদনস’। হায়! সখি, ভাবিতেছিলাম
কি আছে অদৃষ্টে মম,—প্রেম-সিংহাসন,
কিম্বা রোম-কারাগার! দেখিতে দেখিতে
সঙ্কুচিত আশা-স্রোত প্রণয়-নির্ঝরে
পাইলাম, কিন্তু সখি! সেই সম্মিলনে
উথলিল যেই ঢল প্রেম-প্রস্রবণে—
হৃদয়-প্লাবিনী! সেই সলিল-প্রবাহে
ভেসে গেল মম কুল, শীল, লজ্জা, ভয়;
ভেসে গেল সেই বেগে ভূত, ভবিষ্যত,
বর্ত্তমান উভয়ের; হইল চঞ্চল
বেগে, রোম, মিশরের রাজ-সিংহাসন;
ভেসে গেল সেই স্রোতে সপত্নী‘সিল্ভিয়া’।
ভাসিয়া ভাসিয়া সেই প্রণয়-প্লাবনে
আসিলাম মিশরেতে, প্লাবন-প্রবাহ
সখি! মিশিল সাগরে। স্বজনি! তখন
সকলি অনন্ত! হায়, অনন্ত প্রেমের
অনন্ত লহরী-লীলা! অনন্ত আমোদ
বিরাজিত নিরন্তর অধরে,নয়নে!
অনন্ত, অতৃপ্ত সুখ যুগল-হৃদয়ে!
ভাবিলাম মনে,—প্রেম, সুখ, রাজ্য, ধন,
প্রেমিক-জীবন, হায়! অনন্ত সকল!
যে কাম-সরসী, সখি! করিনু নির্ম্মাণ,
যত পান করি, বাড়ে প্রণয়-পিপাসা;—
অনন্ত পিপাসাতুর নায়ক আমার!
ঢালিয়া দিলাম তাহে জীবন, যৌবন
মম, ঝাঁপ দিল রাজহংস উন্মত্তের
প্রায়,—মদন-বিহ্বল! সেই সরোবরে
কভু মৃণালিনী আমি, সখা মধুকর;
আমি মরালিনী, সখা মরাল সুন্দর।
কখন মৃণাল আমি অদৃশ্য সলিলে,
সখা মদমত্ত করী; সলিলের তলে
কভু আমি মীনেশ্বরী, সখা মীনপতি;–
অধিপতি ক্লিওপেট্রা কাম-সরসীর!
এই রূপে, এই সুখে, গেল দিন, গেল
মাস, চলিল বৎসর, বিজলি-ঝলকে,—
অনঙ্গ-বিলাসে, সুরা, সঙ্গীত-বিহ্বল!
“এক দিন নিজ কক্ষে বসিয়াছি আমি,
মদালসে! শ্লথ দেহ, নিশি-জাগরণে,
অবশ পড়িয়া আছে কোমল ‘ছোফায়’।
কখন পড়িতেছিনু; কভু অন্য মনে
গাইতে ছিলাম গীত গুণ গুণ স্বরে,—
প্রেমময়,—নব রাগে, নব অনুরাগে,
নিরখি অসাবধানে শায়িত শরীর,
প্রতিকুল দেয়ালের দীর্ঘ আরসীতে।
শিথিল হৃদয় যন্ত্রে, কভু চারমিয়ন্!
মধুরে বাজিতে ছিল আনন্দ-সঙ্গীত;
আবার অজ্ঞাতে সখি! না জানি কেমনে
বিষাদ ভাঙ্গিতেছিল সে লয় মধুর।
কখন হাসিতেছিনু, না জানি কারণ;
আবার অজ্ঞাতে অশ্রু নয়নে কখন
হটাৎ আসিতেছিল, না জানি কেমনে।
একটী মানব-ছায়া এমন সময়ে,
পতিত হইল সখি! কক্ষ-গালিচায়;
পলকে ফিরাতে নেত্র দেখিলাম চক্ষে
প্রাণেশ আমার! কিন্তু সেই মূর্ত্তি! যেই
মূর্ত্তি, অন্য দিন কক্ষে প্রবেশিতে মম,
বিকাশিত প্রেমানন্দ, ললাটে, নয়নে;
হাসি রূপে সমুজ্জ্বল করিত অধরে;
নিঃসারিত সম্ভাষিতে,—‘কই গো কোথায়
প্রাচীনা নীলজ চারু ফণিনী আমার?’
সেই মূর্ত্তি আজি দেখি গাম্ভীর্য্য-আধার,
কাঁপিল হৃদয় মম।–‘ক্লিওপেট্রা! এই
দুঃসময় ঘেরিতেছে জলধর রূপে,
চারি দিগে এণ্টনির অদৃষ্ট-আকাশ।
যদি এ সময়ে, নাহি উড়াই তাহারে,
হইবে অসাধ্য পরে। রোম হ’তে আজি
কুসম্বাদ; আন্তরিক-বিগ্রহ-কৃপাণে
‘ইতালি’ কণ্টকাকীর্ণ! কৃপাণ-জিহ্বায়
প্রতিবিম্বে রবিকর নির্ভয়ে দিবসে,
উপহাসি এণ্টনির বিলাস-জীবন।
প্রেয়সি! বিদায় তবে কিছু দিন-তরে
দেও যাই, কটাক্ষে সে কৃপাণ সকল
ছিন্ন শস্যরাশিমত, আসি শোয়াইয়া।
আসি ডুবাইয়া নেত্র-নিমেষে ‘পম্পির’
জলযুদ্ধ-সাধ, সেই সমুদ্রের জলে;—
পিতার অন্তিম শয্যা প্রদানি পুত্রেরে!
দেও অনুমতি তবে। ঈর্ষার অনল
জ্বলে থাকে যদি তব রমণী-হৃদয়ে,
নিবাও তাহারে, শুন দ্বিতীয় সংবাদ—
মরেছে ‘ফুল্ভিয়া’ আমার—’
মরেছে!—
‘ফুল্ভিয়া’।
কি? মরেছে ‘ফুল্ভিয়া’!
‘হাঁ, মরেছে ‘ফুল্ভিয়া’।
দংশেছিল এণ্টনির বিচ্ছেদ-ভুজঙ্গ
যেই নালে, সেই নালে ‘মরেছে ফুল্ভিয়া’।
এ সম্বাদে, চারমিয়ন্! অমৃত ঢালিল।
এই মুক্তাহার নাথ পরাইয়া গলে,
বলিলেন,—‘এই হারে যত মুক্তা প্রিয়ে!
ইতালির রণজয় করিছে প্রচার,
তত রাজ্যে সাজাইব মুকুট তোমার,
কল্যাণি! অন্যথা এই তরবারি মম,
বিসর্জ্জি আসিব ওই ভূমধ্য-সাগরে।
প্রেয়সি! বিদায় দেও যাইব এখন।
মিশরে থাকিবে তুমি, কিন্তু ছায়া তব
যেতেছি লইয়া মম ছায়াতে মিশায়ে;
বিনিময়ে চিত্ত মম যাইব রাখিয়া
তব সহচর সদা’,—
ধরিয়া গলায়,
উন্মত্তের প্রায় সখি! কত কাঁদিলাম,
কত বলিলাম—‘নাথ! নাহি চাহি আমি
রাজ্যধন; মুহূর্ত্তের ভালবাসা তব,
শত শত রাজ্যে কিম্বা সমস্ত ধরায়,
নাহি পাবে ক্লিওপেট্রা। পৃথিবী কি ছার!
স্বর্গ তুচ্ছ তার কাছে, প্রাণেশ তোমার
প্রণয়-রাজ্যের রাণী যেই সুভাগিনী’।
কত কাঁদিলাম, সখি! কত বলিলাম,
কত শুনিলাম, কিন্তু বিফল সকল!
রণোম্মত্ত কেশরীরে, কেমনে স্বজনি!
রমণী-বীতংস বল, রাঁখিবে বাঁধিয়া?
ফুটিল অধরে উষ্ণ কোমল চুম্বন
বিদ্যুতের মত,—সখি! নাহি জানি আর”।
সুদীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ি, পুনঃ বিধুমুখী,—
হায়! সেই বিধু আজি নিবিড় জলদে
আচ্ছাদিত,—আরম্ভিল,—“পাইলাম জ্ঞান
যবে ওলো চারমিয়ন্! নাহি পাইলাম
আর হৃদয় আমার। নাহি দেখিলাম
চাহি আকাশের পানে, রবি শশী তারা।
ধরাতল মরুভূমি; নাহি তাহে আর
সুশোভার চিহ্ন মাত্র। শব্দ-বহ হায়!
নিঃশব্দ আমার কাণে। কেবল, স্বজনি!
দেখিলাম কি আকাশ, কিবা ধরাতল
এণ্টনিতে পরিপূর্ণ! সুধু সমীরণ
বহিছে এণ্টনি স্বর! দেখিতে, শুনিতে,
কিম্বা ভাবিতে,—এণ্টনি! ক্লিওপেট্রা কর্ণে
কণ্ঠে, নয়নে, হৃদয়ে,—এণ্টনি কেবল!
আহার, পানীয়, নিদ্রা, শয়ন, স্বপন—
এণ্টনি সকল! সখি! কি বলিব আর,
হইল জীবন মম অবিকল ওই
আফ্রিকার মরুভূমি, প্রত্যেক বালুকা-
কণা একটী এণ্টনি! দিবা, নিশি, পক্ষ,
মাস, কিছুই আমার নাহি ছিল জ্ঞান।
গণিতাম কাল আমি বৎসরে কেবল।
অনন্ত ভুজঙ্গ-সম কাল বিষধর,
দাঁড়াইয়া এক স্থানে, হ’তো হেন জ্ঞান,
দংশিছে আমায় যেন অনন্ত ফণায়।
প্রভাতে উঠিলে রবি, ভাবিতাম মনে,
জিনিতে মিশর ওই আসিছে এণ্টনি,
রণবেশে! রবি অস্তে, সায়াহ্নে আবার
ভাবিতাম বীরশ্রেষ্ঠ চলিগেলা রোমে।
হাসি মুখে শশধর ভাসিলে গগনে,
ভাবিতাম আসিতেছে এণ্টনি আবার,
প্রণয়-পীযূসে হায়! যুড়াতে আমায়।
অস্ত গেলে নিশানাথ প্রাণনাথ গেলা
ছাড়ি ভাবিতাম মনে।
“এই রূপে সখি!
গেল যুগ, গেল বর্ষ, কিম্বা মাস, দিন,
নাহি জানি। এক দিন তাপিত হৃদয়
যুড়াইতে জ্যোৎস্নায়, শুয়েছি নিশীথে
সুকোমল ‘কৌচ’-অঙ্কে, ছাদের উপরে।
সেই দিন দূত-মুখে, নব পরিণয়
এণ্টনির, নারী-রত্ন ‘অগস্তার’ সনে
শুনিয়াছিলাম;—তরুভ্রষ্ট হায়! যেই
বিশুষ্ক বল্লরী, কেন রে দারুণ বিধি!
হেন বজ্রাঘাত পুনঃ তাহার উপরে?
শুয়েছি; উপরে নীল চিত্রিত আকাশ
প্রসারিত,—নাক্ষত্রিক চারু রঙ্গ-ভূমি!
মধ্যস্থলে শশধর হাসিয়া হাসিয়া,
রূপের গৌরবে যেন ঢলিয়া ঢলিয়া
করিতেছে অভিনয়। নক্ষত্র সকল
নীরবে, অচল ভাবে করিছে দর্শন
সেই সুশীতল রূপ। কেহ বা আনন্দে
জ্বলিতেছে; অভিমানে নিবিতেছে কেহ;
কেহ রূপে বিমোহিত পড়িছে খসিয়া।
ছুটিছে জীমূত-বৃন্দ উন্মত্তের প্রায়
আলিঙ্গিতে সেই রূপ; উথলিছে সিন্ধু;
রূপে মুগ্ধ—অধিক কি—ঘূরিছে ধরণী।
এই অভিনয় সখি! দেখিতে দেখিতে
কতই নিদ্রিত ভাব উঠিল জাগিয়া
হৃদয়ের! সময়ের তামস-গহ্বরে,
এই চন্দ্রালোকে, অঙ্কে অঙ্কে দেখিলাম
বিগত জীবন। কভু ভাবিলাম মনে,
আমি চন্দ্র, মেঘবৃন্দ বীরেন্দ্র সকল;
নক্ষত্র মানবচয়; আমি শশধর,
সিন্ধু বীরের অন্তর। আবার কখন
ভাবিলাম আমি চন্দ্র, ধরণী এণ্টনি।
ভাবিতেছিলাম পুনঃ, এই চন্দ্রালোকে,
নব প্রণয়িনী-পাশে, নব অনুরাগে,
বসিয়া সুদূর রোমে প্রাণেশ আমার,
ভুলেছে কি ক্লিওপেট্রা? ভাবিছে কি মনে
‘কোথায় নীলজ চারু ফণিনী আমার’—
সুদীর্ঘ নিশ্বাস সহ? কিম্বা অগস্তার
নবীন প্রণয়-রাজ্যে এবে এণ্টনির
হয়েছে কি অধিকৃত সমস্ত হৃদয়?
করেছে কি ক্লিওপেট্রা চির-নির্ব্বাসিত?
নবীনা সপত্নী নামে; ওলো চার্মিয়ন্!
জ্বলিয়া উঠিল তীব্র ঈর্ষার অনল
রমণী-হৃদয়ে; যেন বিশুষ্ক কাননে
অকস্মাৎ প্রবেশিল ভীম দাবানল।
রমণীর অভিমানে রমণা-হৃদয়
ভরিল। আরক্ত নেত্রে ছুটিল অনল।
যেই মানসিক বৃত্তি, প্রণয়ের তরে
ধরার কলঙ্ক রাশি ঠেলেছিল পায়ে,
আজি অপমানে পুনঃ সেই বৃত্তি-চয়
হ’লো খড়্গ-হস্ত সেই প্রণয়-ঘাতকে।
সুষুপ্ত ভুজঙ্গ যেন, দুষ্ট প্রহারকে,
বিস্তারিয়া ফণা ক্রোধে ছুটিল দংশিতে!
‘কি? মিশরের ঈশ্বরী! টলেমি-দুহিতা!
ক্লিওপেট্রা আমি! রূপে বিশ্ব-বিমোহিনী!
যে রূপের তেজে সেই ভুবন-বিজয়ী
সিজারের তরবারি পড়িল খসিয়া!
সামান্য গুঞ্জিকা তার, সে রূপ-রতন
এণ্টনি ঠেলিল পায়ে?’ তীরের মতন
বসিনু শয্যায়; কিন্তু দুর্ব্বল শরীর
দুরূহ যন্ত্রণা, চিন্তা সহিতে না পারি,
ভুজঙ্গে দংশিত যেন, পড়িল ঢলিয়া
শয্যার উপরে পুনঃ। মধুরে তখন
বহিল শীতল ‘নীল’-নীরজ অনিল।
কোমল পরশে ধীরে হইল সঞ্চার
অৰ্দ্ধ নিদ্রা, অৰ্দ্ধ মূর্চ্ছা, ক্লান্ত কলেবরে।
দেখিনু স্বপন, সখি! কি যে দেখিলাম,
এখনো স্মরিতে কেশ হয় কণ্টকিত।
দেখিনু শার্দ্দূল এক,—ভীষণ-আকৃতি!—
নিবিড় অরণ্যে মম ধাইছে পশ্চাতে,
বিস্তারিয়া মুখ। ‘ত্রাহি ত্রাহি’—বলি আমি
চাহিনু আকাশ-পানে। দেখিলাম সখি!
অপূর্ব্ব তপন এবে উদিল গগনে
উজ্জ্বলিয়া দশ দিশ্। করে আকৰ্ষিয়া
সেই মার্ত্তণ্ড আমারে তুলিল আকাশে,
সখি! আমি শোভিলাম শশধর-রূপে
বামে সবিতার। হায় এমন সময়ে
অকস্মাৎ রাহু আসি গ্রাসিল তাহারে।
হইয়া আশ্রয়হীনা আমি অভাগিনী
পড়িতেছিলাম বেগে, অৰ্দ্ধ পথে সখি!
বীর-সূর্য্য অন্য জন, হৃদয় পাতিয়া,
লইল আমারে। আমি আনন্দে মাতিয়া,
পরাইনু প্রেম-হার গলায় তাহার।
কিন্তু কি কুক্ষণে হায়! বলিতে না পারি!
সে হার-পরশে বীর হৃদয় তাহার,—
ফাটিত যে উরস্ত্রাণ রণরঙ্গে মাতি;—
হইল বিলাসে যেন নারী সুকুমারী!
পিধান হইতে অসি পড়িল খসিয়া,
(অরাতি মস্তকে ভিন্ন, নামে নাহি যাহা,)
কুসুম শয্যায়। শেষে মাথার মুকুট,
পড়িল খসিয়া ঐ ভূমধ্য-সাগরে,
অস্তগামী রবি যেন! কি বলিব আর,
যেই বক্ষে অরাতির অসংখ্য কৃপাণ
গিয়াছে ভাঙ্গিয়া,—যেন প্রচণ্ড শিলায়
স্ফটিকের দণ্ড, কিম্বা মত্ত গজদন্ত,
হায় রে! যেমতি চন্দ্র-পর্ব্বত-প্রস্তরে,—
মম প্রেমহার তীক্ষ্ণ ছুরিকার মত,
সেই বক্ষে প্রিয় সখি পশিল আমূল!
তখন সে হার ধরি ভুজঙ্গের বেশ,
ছুটিল পশ্চাতে মম। সভয়ে তখন,
ডাকিতেছি—‘কোথা নাথ! এমন সময়ে,
কোথা নাথ!’—
‘প্রিয়ে এই চরণে তোমার!’—
যে সঙ্গীতে এই ধ্বনি পশিল শ্রবণে,
সে সঙ্গীত ক্লিওপেট্রা শুনিবে না আর।
ভাঙ্গিল স্বপন সখি ফুটিল চুম্বন,
বিশুষ্ক অধরে মম। মেলিয়া নয়ন,
দেখিলাম প্রাণনাথ হৃদয়ে আমার!
অভিমানে বলিলাম,—সে ‘কি নাথ, ছাড়ি
রোম রাজ্য, ছাড়ি নব প্রণয়িনী, কেন
এখানে আপনি? কিম্বা এ আপনি নন,
এই ছায়া আপনার আসিয়াছে বুঝি,
বিরহ-আতপ-তাপে যুড়াতে আমায়।’
‘নিমজ্জিত হ’ক রোম টাইবরের জলে,
রাজ্য, প্রণয়িনী সহ। এই রাজ্য মম’,—
বলিলা হৃদয়ে ধরি হৃদয় আমার।
‘প্রণয়িনী ক্লিওপেট্রা; ইহ জীবনের
সুখ এই’,– পুনঃ নাথ চুম্বিলা অধর;
‘জীবন তোমার প্রেম, বিরহ, মরণ!’ .
“দূরে গেল অভিমান, রমণীর প্রেম-
স্রোতে অভিমান, সখি! বালির বন্ধন।
বলিলাম, ‘সত্য নাথ! এই হৃদয়ের
তুমি অধীশ্বর, কিন্তু বলিব কেমনে
এই ক্ষুদ্র রাজ্য তব? অনন্ত জলধি-
জলে যেই শশধর করে ক্রীড়া, নাথ!
ক্ষুদ্র সরসীর নীরে মিটিবে কেমনে
ক্রীড়া-সাধ, প্রাণেশ্বর! সেই শশাঙ্কের?
প্রণয়-বারিদ তুমি! তুমি যদি তবে
রাখ সসলিলা এই সরসী তোমার,
যোগাবে অনন্ত বারি, এই প্রেমাধিনী’।
“মৈশরী-হৃদয়াকাশে প্রণয়ের শশী
প্রকাশিল যদি পুনঃ, মিশরে আবার
ছুটিল দ্বিগুণ বেগে আমোদ জোয়ার।
কত রাজ্য সিংহাসন, আসিল ভাসিয়া
ক্লিওপেট্রা-পদতলে বলিব কেমনে।
সমস্ত পূরব রাজ্য মিলি এক তানে,—
‘পূরব রাজ্যের রাণী, মিশর ঈশ্বরী!’—
গাইল আনন্দস্বরে। সেই ধ্বনি রোমে
জাগাইল সুপ্ত সিংহ কনিষ্ঠ সিজার
কুক্ষণে। কুগ্রহ সখি! হইল তখন
ক্লিওপেট্রা, এণ্টনির অদৃষ্টে সঞ্চার।
শুনিনু গর্জ্জন তার সহস্ৰ কামানে,
মিশরে বসিয়া সখি! ছুটিল হর্য্যক্ষ
অসংখ্য অর্ণব পোতে, গ্রাসিতে মিশরে,
শতধা বিদারি ভীম ভূমধ্য-সাগর,
সহোদরা-অপমান প্রতিবিধানিতে।
নির্ভয় হৃদয়ে সখি! সাজিল এণ্টনি,
হেলায় খেলিতে যেন বালকের সনে।
বলিলা আমারে নাথ! হাসিয়া হাসিয়া—
‘মিশরে বসিয়া প্রিয়ে! দেখ মুহূর্ত্তেকে
বালকের ক্রীড়া-সাধ আসি মিটাইয়া।’
ধৈর্য্য মানিল না মনে; ভাবিলাম যদি
পাপিষ্ঠা সপত্নী আসি প্রাণেশে আমার
ল’য়ে যায় এ কৌশলে। বলিলাম—‘নাথ!
বহুদিন-সাধ মম করিতে দর্শন
অর্ণব-আহব, প্রভু পূরাও সে সাধ,
তুমি যদি না পূরাবে কি পূরাবে আর
বীরেন্দ্র!’ হাসিয়া নাথ বলিলা আমারে,—
‘সাজ তবে, বীরেন্দ্রাণি! বালকের রণে
মহারথী ক্লিওপেট্রা, সারথি এণ্টনি!’
আপনি প্রাণেশ, রণবেশে সাজাইলা
আমায়, সজনি সুখে! সাজাইতে, হায়!
কত যে কি সুখ নাথ দেখিলা নয়নে,
চুম্বিলা অধরে, সখি! পরশিলা করে,
বলিব কেমনে? অঙ্কে অঙ্কে বিরাজিয়া
স্ফুট নলিনীর, অলির যে সুখ, পদ্ম
বুঝিবে কেমনে? আমি আপনি স্বজনি!
বীরবেশে প্রেমাবেশে হইনু বিভোর।
ফুরাইলে বেশ; নাথ হাসিয়া আদরে,
সমর্পিয়া করে চারু কুসুমের হার,
বলিলা—‘কি কাজ প্রিয়ে! অস্ত্রেতে তোমার?
বিনা রণে, এই অস্ত্রে, জিনিবে সংসার’।
“অসংখ্য অর্ণবযান, সৈন্য, অস্ত্র, ভরে
প্রায় নিমজ্জিত কায়; বিশাল ধবল
পক্ষে বন্দী করি দেব প্রভঞ্জনে দর্পে;
বিক্রমে ফেণিয়া সিন্ধু; চলিল সাঁতারি
যেন প্রমত্ত বারণ। চলিলাম আমি
নির্ভয়ে, কেশরী যেই হরিণীরে সখি!
দিয়াছে অভয়, তবে কি ভয় জগতে?
বীর-প্রণয়িনী আমি, বীরের সঙ্গিনী,
ডরিব কাহারে? কিন্তু অবলা-মনের
না জানি কি গতি! যত আশ্বাসিয়া মন
করি ভাসমান, তত ভাবী আশঙ্কায়
হইতেছে ভারি! ততকাল রঙ্গে মম
চকিত কল্পনা, হায়! অজ্ঞাতে কেমনে,
চিত্রিতেছে ভবিষ্যত! যদিও না জানি,—
পরচিত্ত-অন্ধকার!—বুঝিনু তথাপি
ভাবী অমঙ্গল ছায়া পড়েছে হৃদয়ে
এণ্টনির। লুকাইতে সে করাল ছায়া
রমণীর কাছে নাথ, হয়েছে মগন
সঙ্গীতে সুরায়।
“দ্রুত ভাঙ্গিল স্বপন।
ভয়ঙ্কর!! একি দেখি সম্মুখে আমার!
অসীম বারিদ-পুঞ্জ, ভীম-কলেবর,
পড়েছে খসিয়া ওকি জলধি-হৃদয়ে?
খেলিছে বিদ্যুত ওকি জীমূত-ঘর্ষণে?
ওকি শব্দ ভয়ঙ্কর? জীমূত গর্জ্জন?
সকলই ভ্রম! সখি, শুকাইল মুখ;
বিপক্ষ তরণী-ব্যূহ সজ্জিত সমরে!
বিদ্যুত,—কামান-অগ্নি; দুর্জ্জয় কামান
মুহুর্মুহুঃ মেঘ মন্ত্রে গর্জ্জিছে ভীষণ!
যেই দৃশ্য—নেত্রে, কর্ণে, চিত্তে ভয়ঙ্কর!—
দেখিলাম চারমিয়ন্, বলিব কেমনে
কামিনী-কোমল-কণ্ঠে? শুনিবে তোমরা
নারী-কোমল-হৃদয়ে? দেখে থাক যদি
প্রতিকূল প্রভঞ্জনে প্রাবৃট-অম্ভোদ
আঘাতিতে পরস্পরে, বিলোড়ি গগন,
ছিন্ন নক্ষত্র-মণ্ডল, বুঝিবে কেমনে
প্রতিকূল তরীব্যূহ পশিল সংগ্রামে।
মুহূর্ত্তেকে ধূম-পুঞ্জে ঢাকিল জলধি।
আঁধারিয়া দশদিশ্; কিন্তু না পারিল
সংহারক রণমূর্ত্তি লুকাতে আঁধারে।
সেই অন্ধকারে সখি! অঙ্গ মিশাইয়া
তরীর উপরে তরী ঝাপ দিল রোষে।
গর্জ্জিল কামান, ঝাঁপ দিল শত সূর্য্য
ফেণিল সাগরে, তরীবৃন্দ বিদারিয়া
নিমজ্জিয়া জলে, নররক্তে কলঙ্কিয়া
সুনীল সলিলে। হায়! সখি, তুচ্ছ নর,
আপনি জলধি, সেই ভীষণ নিৰ্ঘাত,
তীব্র অনল-বর্ষণ, না পারি সহিতে,
করিতেছে ছট্ফট্ উত্তাল তরঙ্গে,
ফেণিয়া ফেণিয়া; ঘন ঘন নিশ্বাসিয়া
পড়িতেছে আছাড়িয়া কূলের উপরে।
তরণীর প্রতিঘাত; কামান-গর্জ্জন;
দহ্যমান তরণীর অনল-হুঙ্কার;
বন্দুকের অগ্নিবৃষ্টি, অস্ত্র-ঝনৎকার;
জেতার বিজয়ধ্বনি; জিতের চিৎকার;—
ভীষণ তরঙ্গ-ভঙ্গ, সিন্ধু-আস্ফালন
ভয়ঙ্কর! নিরখিয়া উড়িল পরাণ;
অবলা হৃদয় ভয়ে হইল অচল।
বলিলাম কর্ণধারে,—‘ফিরাও তরণী,
বাঁচাও পরাণ’। আজ্ঞা মাত্র সংখ্যাতীত
ক্ষেপনী-ক্ষেপণে, বেগে চলিল তরণী
মিশর-উদ্দেশে হায়! মন্দুরার মুখে
ছুটিল তুরঙ্গ যেন। কিছুক্ষণ পরে
সভয়ে ফিরায়ে আঁখি দেখিতে পশ্চাতে,
দেখিলাম ভাঙ্গিয়াছে কপাল আমার!
না দেখি তরণী মম, রণে ভঙ্গ দিয়া
উন্মত্তের প্রায় ওই আসিছে এণ্টনি!
আকাশ ভাঙ্গিয়া হায়! পড়িল মস্তকে
অকস্মাৎ! ভাবিলাম মনে, এ সময়ে
নাথের সহিত যদি হয় দরশন,
অনুতাপে নাহি জানি কোন অপমান
করিবে আমার; হায়! কেন আসিলাম,
আমি কেন মজিলাম! নাহি ডুবিলাম
কেন জলধির তলে? নাহি মরিলাম
সেই বিষম সংগ্রামে, নাথের সম্মুখে?
কেন আসিলাম আমি!—কেন মজিলাম!
“অনাহারে, অনিদ্রায়, মুমূর্ষের মত
অবতীর্ণা হইলাম মিশরের তীরে
বহুদিনে। এই রণে গিয়াছিনু, সখি!
এণ্টনির সোহাগিনী, পৃথিবীর রাণী;
আসিলাম ভিখারিণী ডুবায়ে এণ্টনি।
চলিলাম গৃহমুখে, বিসর্জ্জন করি
মাথার মুকুট, ভাবী রোম-সিংহাসন,
এণ্টনির প্রেম,—হায়! মৈশরী-জীবন!—
ভূমধ্য-সাগরে; এই জীবনের মত
বিসর্জ্জিয়া যত আশা-আকাশ-কুসুম,
চলিলাম গৃহে;—কোন মতে, কোন পথে,
নাহি ছিল জ্ঞান। নিল উড়াইয়া যেন
মানসিক ঝটিকায়। প্রবেশি প্রাসাদে
দেখিলাম অন্ধকার! নাহি সে মিশর
রাজ্য, নাহি রাজধানী, দেখিনু কেবল,—
অন্ধকার,—মরুভূমি,—সমস্ত ভূতল
হইতেছে তরঙ্গিত ভীম ভূকম্পনে।
সেই অন্ধকার, সেই মরুভূমি-মাঝে
দেখিনু কেবল—মম সমাধি ভবন!
চলিলাম সেই দিগে্, উন্মাদিনী আমি!
বলিলাম—তোমারে কি? না হয় স্মরণ,
চারমিয়ন্! বলিলাম—‘আসিলে এণ্টনি,
অনুতাপে ক্লিওপেট্রা ত্যজিল জীবন,
বলিও প্রাণেশে মম; বলিও তাঁহারে,
মৈশরীর শেষ ভিক্ষা—ক্ষমিও এণ্টনি!’
সমাধির দ্বারে সখি! পড়িল অর্গল।
“আসিল এণ্টনি; সখি! নাথের সে মূর্ত্তি
স্মরিলে এখনো মম বিদরে হৃদয়!
প্রসারিত নেত্রদ্বয়, উন্মত্ত, উজ্জ্বল!
প্রশস্ত ললাট যেন ধবল প্রস্তর,
নাহি রক্ত-চিহ্ন মাত্র! বিষাদ লিখেছে
রেখা কপোলে, কপালে, অনুকারী যেন
বাৰ্দ্ধক্যে! চিত্রেছে শুক্লে মস্তক সুন্দর!
এত রূপান্তর সখি! এই কত দিনে
গিয়াছে নাথের যেন কতই বৎসর!
শুনিলা সখীর মুখে, স্তম্ভিতের মত,—
‘অনুতাপে ক্লিওপেট্রা, ত্যজিল জীবন,
মৈশরীর শেষ ভিক্ষা, ক্ষমিও এণ্টনি’।
‘ক্ষমিলাম’——বলি নাথ হৃদয় চাপিয়া
দুই হাতে, প্রবেশিলা রাজ-হর্ম্মে বেগে,
বিদ্যুতের গতি! হেন কালে চারি দিগে
উঠিল নগরে সখি! ভীম কোলাহল।
ভূমধ্য-সাগর যেন তীর অতিক্রমি
প্লাবিল মিশর! ত্রাসে বাতায়ন পথে
দেখিলাম, নহে সিন্ধু, সৈন্য সিজারের,
লুটিতেছে হতভাগ্য নগর আমার।
অপূর্ব্ব সিজার-গতি! চক্ষুর নিমেষে
ঘেরিল সমস্ত পুরী, সমাধি আমার;—
পড়িনু ব্যাধের জালে আমি কুরঙ্গিনী!
কিন্তু ও কি সহচরি? সমাধির তলে?
ওই শয্যার উপরে?—মুমূর্ষু এণ্টনি!
চাহিলাম ঝাঁপ দিতে শয্যার উপরে,
তুমি ধরিলে অমনি। তুলিলাম নাথে
সমাধি উপরে, হায়! সমাধি উপরে!
এই ছিল লেখা সখি! কপালে আমার,
কে জানিত! প্রাণনাথ বলিলা আমারে—
সেই স্বর প্রিয়সখি! অস্ফুট দুর্ব্বল!—
মৈশরি! ভবের লীলা ফুরাইল আজি
এণ্টনির; পৃথিবীতে প্রেয়সি! আমার
আর নাহি প্রয়োজন; ফুরাইল কাল,
আমি যাই অস্তাচলে। এই অস্ত্র-লেখা
প্রিয়ে হৃদয়ে আমার, নহে শত্রু দত্ত;
হেন সাধ্য কার? নাহি এই ভূমণ্ডলে
এণ্টনি বিজয়ী,—বিনে ক্লিওপেট্রা,—আজি
এণ্টনির করে প্রিয়ে! আহত এণ্টনি।
আসিয়াছি, শেষ সুরা পাত্র করি পান
তব সনে, প্রণয়িনী! লইতে বিদায়;
দেও, প্রিয়তমে! যাই—বিদায়-চুম্বন’।
“সুরা করিলাম পান,চুম্বিনু চুম্বন;
শুনিনু অস্ফুট স্বরে, জন্মের মতন—
‘ক্লিও—পেট্রা!—প্রণ—য়ি—নী!’
‘প্রাণনাথ! আমি
ক্লিওপেট্রা অভাগিনী?’—বলি উচ্চৈঃস্বরে,
আঁটিয়া হৃদেশে সখি! ধরিনু হৃদয়ে।
দেখিলাম ক্রমে ক্রমে যুগল-নয়ন—
জ্যোতিতে যাহার রোম আছিল উজ্জ্বল;
অসঙ্খ্য সমর-ক্ষেত্রে, কিরণ যাহার
ছিল বিভাসিত যেন মধ্যাহ্ন-তপন;
খেলিত বিদ্যুত মত সৈন্যের হৃদয়ে
উত্তেজিয়া রণরঙ্গে;—নিবিল ক্রমশঃ।
মানব-গৌরব-রবি হ’লো অস্তমিত।
‘প্রাণেশ্বর! প্রাণনাথ! এণ্টনি আমার!’—
ডাকিলাম বারম্বার উন্মাদিনী-প্রায়;
‘প্রাণেশ্বর! প্রাণনাথ! এণ্টনি আমার!’—
শুনিলাম উত্তরিল সমাধি-ভবন।
প্রাণে——শ্বর!——প্রাণ!——”
আহা! সহিল না আর;
অবশ মস্তক-ভরে, গ্রীবা দুঃখিনীর
পড়িল ভাঙ্গিয়া, বামা পড়িল ভূতলে,
ব্যাধ-শরে বিদ্ধ যেন বন-কপোতিনী!
অতি ব্যস্ত সখিদ্বয় ধরাধরি করি,
তুলিল শয্যায় শ্বেত প্রস্তর-পুত্তলী।
উরঃ-বাস, কটীবন্ধ, করিয়া মোচন,
শীতল তুষার-বারি, উরসে, বদনে,
বরষিল; কিন্তু নাহি পাইল চেতন
অভাগিনী! তবু নাহি মেলিল নয়ন।
সহচরীদ্বয় দুঃখে বসিয়া নিকটে
কান্দিতেছে সখী-শোকে,—হৃদয় বিকল!
অকস্মাৎ তীরবেগে, বসিয়া শয্যায়,—
মুষ্টিবদ্ধ করদ্বয়, বিস্তৃত নয়ন—
তীব্র জ্যোতিঃ-পরিপূর্ণ!—চাহি শূন্যপানে,
উন্মত্ত, বিকৃত, কণ্ঠে বলিতে লাগিল।—
“পরিণয়!—পরিণয়!—তুচ্ছ পরিণয়
যদি না থাকে প্রণয়! প্রণয়-বিহনে
পরিণয়! পরিমল-হীন পুষ্প! মণি-
হীন ফণী,—আজীবন অনন্ত দংশক!
মধু-হীন মধু-চক্র,—মক্ষিকা-পূরিত!
হেন পরিণয়-বলে, ওই দেখ সখি!
এণ্টনির পাশে বশি, অগস্তা সিল্ভিয়া,
আমায় কুলটা বলি করে উপহাস।
কি কুলটা ক্লিওপেট্রা! প্রণয়ের তরে
বিসর্জ্জিয়া কুল আমি পেয়েছিনু যারে;
কুল তুচ্ছ, প্রাণ দিয়া তোরা অভাগিনী
না পাইয়া তারে, আজি তোরা গরবিনী,
পোড়া পরিণয় বলে? পরিণয় বলে
জীবলোকে তোরা নাহি পাইলি যাহারে,
দেখিব অমরলোকে, পরিণয় বলে
তারে রাখিবি কেমনে।” উন্মাদিনী হায়!
ছুটিল তড়িত বেগে, সহচরীদ্বয়,
না পারিল প্রাণপণে রাখিতে ধরিয়া।
প্রবেশিয়া কক্ষান্তরে, দ্রুত-হস্তে বামা
একটী সুবর্ণ-কৌটা খুলিল যেমতি,
ক্ষুদ্র বিষধর এক ফণা বিস্তারিয়া,
বসাইল বিষদন্ত কোমল হৃদয়ে,—
রূপে মুগ্ধ ফণী যেন করিল চুম্বন!
সখীদ্বয় উচ্চৈঃস্বরে করিল চীৎকার,
ভূতলে ঢলিয়া আহা! পড়িল মৈশরী।
“এই বেশে চার্মিয়ন্! ভেটিয়া ছিলাম
নাথে চিদনস্ তীরে; এই বেশে আজি
চলিলাম প্রাণনাথে ভেটিতে আবার।”
বলিতে বলিতে বিষে, কালিমা সঞ্চার,
করিল অতুল রূপে; যেই রূপে হায়!
সমস্ত রোমান-রাজ্য—প্রাচীনা পৃথিবী—
ছিল বিমোহিত; যেই রূপে জলে, স্থলে,
হ’লো প্রজ্জ্বলিত কত সমর-অনল;
কতই বিপ্লবে রোম হ’লো বিপ্লাবিত;
নিবিল সে রূপ আজি, মরিল মৈশরী,
সমর্পিয়া কালে পূর্ণ যৌবন-রতন;
অপূর্ব্ব রমণী-কীর্ত্তি—রূপে, গুণে, দোষে!—
রাখি ভূমণ্ডলে হায়! রাখি প্রতিবিম্ব
অসংখ্য প্রস্তরে, পটে, কাব্যে, ইতিহাসে।
সম্পূর্ণম।
Public domainPublic domainfalsefalse
More in Poetry
Poetry
Palanquin Bearers
Lightly, O lightly we bear her along, She sways like a flower in the wind of our song; She skims like a bird on the foam of a stream; She floats like a laugh from the lips of a dream. Gaily, O gaily we glide and we sing,...
Poetry
Thou Hast Made Me Endless (Gitanjali 1)
Thou hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life. This little flute of a reed thou hast carried over hills and dales, and hast breathed...
Poetry
Where the Mind is Without Fear (Gitanjali 35)
Where the mind is without fear and the head is held high; Where knowledge is free; Where the world has not been broken up into fragments by narrow domestic walls; Where words come out from the depth of truth; Where tirel...
Comments (0)
Log in to join the conversation.