দিন শেষ হয়ে এল, আঁধারিল ধরণী;     আর বেয়ে কাজ নাই তরণী।   “হাঁগো এ কাদের দেশে   বিদেশী নামিনু এসে,”     তাহারে শুধানু হেসে যেমনি-   অমনি কথা না বলি’   ভরা ঘট ছলছলি’     নতমুখে গেল চলি তরুণী!     এ ঘাটে বাঁধিব মোর তরণী। নামিছে নীরব ছায়া ঘন বন-শয়নে,     এদেশ লেগেছে ভাল নয়নে।   স্থির জলে নাহি সাড়া,   পাতাগুলি গতিহারা,     পাখী যত ঘুমে সারা কাননে,—   শুধু এ সোনার সাঁঝে   বিজনে পথের মাঝে     কলস কাঁদিয়া বাজে কাঁকণে।     এদেশ লেগেছে ভাল নয়নে। ঝলিছে মেঘের আলো কনকের ত্রিশূলে,     দেউটি জ্বলিছে দূরে দেউলে।   শ্বেত পাথরেতে গড়া   পথখানি ছায়া-করা,     ছেয়ে গেছে ঝরে’-পড়া বকুলে।   সারি সারি নিকেতন,   বেড়া দেওয়া উপবন,     দেখে পথিকের মন আকুলে।    দেউটি জ্বলিছে দূরে দেউলে। রাজার প্রাসাদ হতে অতি দূর বাতাসে    ভাসিছে পূরবী গীতি আকাশে।  ধরণী সমুখপানে  চলে গেছে কোন্‌খানে,    পরাণ কেন কে জানে উদাসে!  ভাল নাহি লাগে আর  আসা যাওয়া বারবার    বহু দূর দুরাশার প্রবাসে।    পূরবী রাগিণী বাজে আকাশে। কাননে প্রাসাদচূড়ে নেমে আসে রজনী,    আর বেয়ে কাজ নাই তরণী!  যদি হোথা খুঁজে পাই  মাথা রাখিবার ঠাঁই,    বেচাকেনা ফেলে যাই এখনি,—  যেখানে পথের বাঁকে  গেল চলি নত আঁখে    ভরা ঘট লয়ে কাঁধে তরুণী!    এই ঘাটে বাঁধ মোর তরণী! ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৩০২। — চিত্রা (1896)