ভবানী ঠাকুর অঙ্গীকার মত দুই জন স্ত্রীলোক পাঠাইয়া দিলেন। একজন হাটে ঘাটে যাইবে, আর একজন প্রফুল্লের কাছে অনুক্ষণ থাকিবে। দুই জন দুই রকমের। যে হাটে ঘাটে যাইবে, তাহার নাম গোব্‌রার মা, বয়স তিয়াত্তর বছর, কালো আর কালা। যদি একেবারে কাণে না শুনিত, ক্ষতি ছিল না, কোন মতে ইসারা ইঙ্গিতে চলিত; কিন্তু এ তা নয়। কোন কোন কথা কখন কখন শুনিতে পায়, কখন কোন কথা শুনিতে পায় না। এ রকম হইলে বড় গণ্ডগোল বাঁধে। যে কাছে থাকিবার জন্য আসিয়াছিল, সে সম্পূর্ণরূপে ভিন্নপ্রকৃতির স্ত্রীলোক। বয়সে প্রফুল্লের অপেক্ষা পাঁচ সাত বৎসরের বড় হইবে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ—বর্ষাকালের কচি পাতার মত রঙ। রূপ উছলিয়া পড়িতেছে। দুই জনে একত্র আসিল—যেন পূর্ণিমা অমাবস্যার হাত ধরিয়াছে। গোব্‌রার মা প্রফুল্লকে প্রণাম করিল। প্রফুল্ল জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার নাম কি গা?” গোব্‌রার মা শুনিতে পাইল না; অপরা বলিল, “ও একটু কালা—ওকে সবাই গোব্‌রার মা বলে।” প্র। গোব্‌রার মা! তোমার কয়টি ছেলে গা? গোব্‌রার মা। আমি ছিলেম আর কোথায়? বাড়ীতে ছিলেম। প্র। তুমি কি জেতের মেয়ে? গোব্‌রার মা। যেতে আসতে খুব পারব। যেখানে বলিবে, সেইখানেই যাব। প্র। বলি, তুমি কি লোক? গোব্‌রার মা। আর তোমার লোকে কাজ কি মা! আমি একাই তোমার সব কাজ ক’রে দেব। কেবল দুই একটা কাজ পার্‌ব না। প্র। পার্‌বে না, কি? গোব্‌রার মার কাণ ফুটিল। বলিল, “পার্‌ব না, কি? এই জল তুল্‌তে পার্‌ব না। আমার কাঁকালে জোর নাই। আর কাপড় চোপড় কাচা—তা না হয় মা, তুমিই ক’রো।” প্র। আর সব পার্‌বে ত? গো-মা। বাসন টাসনগুলো মাজা—তাও না হয় তুমি আপনিই কর্‌লে। প্র। তাও পার্‌বে না; তবে পার্‌বে কি? গো-মা। আর এমন কিছু না—এই ঘর ঝেঁটোন, ঘর নিকোন, এটাও বড় পারি নে। প্র। পার্‌বে কি? গো-মা। আর যা বল। সল্‌তে পাকাব, জল গড়িয়ে দেব, আমার এঁটো পাতা ফেল্‌বো,—আর আসল কাজ যা যা, তা কর্‌ব—হাট কর্‌ব। প্র। বেসাতির হিসাবটা দিতে পার্‌বে? গো-মা। তা মা, আমি বুড়ো মানুষ, হালা কালা, আমি কি অত পারি! তবে কড়িপাতি যা দেবে, তা সব খরচ করে আস্‌ব—তুমি বল্‌তে পাবে না যে, আমার এই খরচটা হলো না। প্র। বাছা, তোমার মত গুণের লোক পাওয়া ভার। গো-মা। তা মা, যা বল, তোমার আপনার গুণে বল। প্রফুল্ল অপরাকে তখন বলিল, “তোমার নাম কি গা?” নবাগতা সুন্দরী বলিল, “তা ভাই, জানি না।” প্রফুল্ল হাসিয়া বলিল, “সে কি; বাপ মায় কি নাম রাখে নাই?” সুন্দরী বলিল, “রাখাই সম্ভব। কিন্তু আমি সবিশেষ অবগত নহি।” প্র। সে কি গো? সুন্দরী। জ্ঞান হইবার আগে হইতে আমি বাপ মার কাছছাড়া। ছেলেবেলায় আমায় ছেলেধরায় চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছিল। প্র। বটে। তা তারাও ত একটা নাম রেখেছিল? সুন্দরী। নানা রকম। প্র। কি কি? সুন্দরী। পোড়ারমুখী, লক্ষ্মীছাড়ী, হতভাগী, চুলোমুখী। এতক্ষণ গোব্‌রার মা আবার কাণ হারাইয়াছিল। এই কয়টা সদাশ্রুত গুণবাচক শব্দে শ্রুতি জাগরিত হইল। সে বলিল, “যে আমায় পোড়ারমুখী বলে, সেই পোড়ারমুখী, যে আমায় চুলোমুখী বলে, সেই চুলোমুখী, যে আমায় আঁটকুড়ী বলে, সেই আঁটকুড়ী”— সুন্দরী। (হাসিয়া) আঁটকুড়ী বলি নাই, বাছা! গো-মা। তুই আঁটকুড়ী বলিলেও বলেছিস্, না বলিলেও বলেছিস্—কেন বল্‌বি লা? প্রফুল্ল হাসিয়া বলিল, “তোমাকে বল্‌চে না গো—ও আমাকে বল্‌চে।” তখন নিঃশ্বাস ফেলিয়া গোব্‌রার মা বলিল, “ও কপাল! আমাকে না? তা বলুক মা, বলুক, তুমি রাগ ক’রো না। ও বামনীর মুখটা বড় কদুয্যি। তা বাছা! রাগ করতে নেই।” গোরার মার মুখে এইরূপ আত্মপক্ষে বীররস ও পক্ষান্তরে শান্তিরসের অবতারণা শুনিয়া যুবতীদ্বয় প্রীতা হইলেন। প্রফুল্ল অপরাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বামনী? তা আমাকে এতক্ষণ বল নাই? আমার প্রণাম করা হয় নাই।” প্রফুল্ল প্রণাম করিল। বয়স্যা আশীর্ব্বাদ করিয়া বলিল, “আমি বামনের মেয়ে বটে—এইরূপ শুনিয়াছি—কিন্তু বামনী নই।” প্র। সে কি? বয়স্যা। বামন যোটে নাই। প্র। বিবাহ হয় নাই? সে কি? বয়স্যা। ছেলেধরায় কি বিয়ে দেয়? প্র। চিরকাল তুমি ছেলেধরার ঘরে? বয়স্যা। না, ছেলেধরায় এক রাজার বাড়ী বেচে এয়েছিল। প্র। রাজারা বিয়ে দিল না? বয়স্যা। রাজপুত্ত্র ইচ্ছুক ছিলেন্—কিন্তু বিবাহটা গান্ধর্ব্বমত। প্র। নিজে পাত্র বুঝি? বয়স্যা। তাও কয়দিনের জন্য বলিতে পারি না। প্র। তার পর? বয়স্যা। রকম দেখিয়া পলায়ন করিলাম। প্র। তার পর? বয়স্যা। রাজমহিষী কিছু গহনা দিয়াছিলেন, গহনা সমেত পলাইয়াছিলাম। সুতরাং ডাকাইতের হাতে পড়িলাম। সে ডাকাইতের দলপতি ভবানী ঠাকুর, তিনি আমার কাহিনী শুনিয়া আমার গহনা লইলেন না, বরং আরও কিছু দিলেন। আপনার গৃহে আমায় আশ্রয় দিলেন। আমি তাঁহার কন্যা, তিনি আমার পিতা। তিনিও আমাকে এক প্রকার সম্প্রদান করিয়াছেন। প্র। এক প্রকার কি? বয়স্যা। সর্ব্বস্ব শ্রীকৃষ্ণে। প্র। সে কি রকম? বয়স্যা। রূপ, যৌবন, প্রাণ। প্র। তিনিই তোমার স্বামী? বয়স্যা। হাঁ—কেন না, যিনি সম্পূর্ণরূপে আমাতে অধিকারী, তিনিই আমার স্বামী। প্রফুল্ল দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, “বলিতে পারি না। কখন স্বামী দেখ নাই, তাই বলিতেছ—স্বামী দেখিলে কখন শ্রীকৃষ্ণে মন উঠিত না।” মূর্খ ব্রজেশ্বর এত জানিত না। বয়স্যা বলিল, “শ্রীকৃষ্ণে সকল মেয়েরই মন উঠিতে পারে; কেন না, তাঁর রূপ অনন্ত, যৌবন অনন্ত, ঐশ্বর্য্য অনন্ত, গুণ অনন্ত।” এ যুবতী ভবানী ঠাকুরের চেলা, কিন্তু প্রফুল্ল নিরক্ষর—এ কথার উত্তর দিতে পারিল না। হিন্দুধর্ম্মপ্রণেতারা উত্তর জানিতেন। ঈশ্বর অনন্ত জানি। কিন্তু অনন্তকে ক্ষুদ্র হৃদপিঞ্জরে পূরিতে পারি না। সান্তকে পারি। তাই অনন্ত জগদীশ্বর, হিন্দুর হৃৎপিঞ্জরে সান্ত শ্রীকৃষ্ণ! স্বামী আরও পরিষ্কাররূপে সান্ত। এই জন্য প্রেম পবিত্র হইলে, স্বামী ঈশ্বরে আরোহণের প্রথম সোপান। তাই হিন্দুর মেয়ের পতিই দেবতা। অন্য সব সমাজ, হিন্দুসমাজের কাছে এ অংশে নিকৃষ্ট। প্রফুল্ল মূর্খ মেয়ে, কিছু বুঝিতে পারিল না। বলিল, “আমি অত কথা ভাই, বুঝিতে পারি না। তোমার নামটি কি, এখনও ত বলিলে না?” বয়স্যা বলিল, “ভবানী ঠাকুর নাম রাখিয়াছেন নিশি, আমি দিবার বহিন নিশি। দিবাকে একদিন আলাপ করিতে লইয়া আসিব। কিন্তু যা বলিতেছিলাম, শোন। ঈশ্বরই পরমস্বামী। স্ত্রীলোকের পতিই দেবতা, শ্রীকৃষ্ণ সকলের দেবতা। দুটো দেবতা কেন, ভাই? দুই ঈশ্বর? এ ক্ষুদ্র প্রাণের ক্ষুদ্র ভক্তিটুকুকে দুই ভাগ করিলে ক‍তটা থাকে?” প্র। দূর্। মেয়েমানুষের ভক্তির কি শেষ আছে? নিশি। মেয়েমানুষের ভালবাসার শেষ নাই। ভক্তি এক, ভালবাসা আর। প্র। আমি তা আজও জানিতে পারি নাই। আমার দুই নূতন। প্রফুল্লের চক্ষু দিয়া ঝর ঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। নিশি বলিল, “বুঝিয়াছি বোন্—তুমি অনেক দুঃখ পাইয়াছ।” তখন নিশি প্রফুল্লের গলা জড়াইয়া ধরিয়া তার চক্ষের জল, মুছাইল। বলিল, “এত জানিতাম না।” নিশি তখন বুঝিল, ঈশ্বর-ভক্তির প্রথম সোপান পতি-ভক্তি। — দেবী চৌধুরাণী (1884)